১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
মারুফা ইয়াসমিন অন্তরা
নারীর চোখে রাজনৈতিক বাস্তবতা: সুযোগ ও শঙ্কার দোলাচল
২০২৪ সালের আগস্টে গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং দেশের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে নারীর জীবনযাত্রায়, এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলেও নারীর চোখে এই বাস্তবতা ঠিক কতটা আশাব্যঞ্জক? রাজনৈতিক পটপরিবর্তন: সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা আগের সরকারের সময়ে রাজনীতিতে নারীর দৃশ্যমান অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও সমালোচকরা প্রায়শই বলতেন, এটি ছিল মূলত সংখ্যাগত বৃদ্ধি। মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা ছিল সীমিত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পর এই চিত্র কিছুটা বদলেছে। কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতিনিধিত্ব না করায়, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন থেকে বেরিয়ে অনেক নারী রাজনৈতিক কর্মী আবার সক্রিয় হয়েছেন। তবে এই নতুন বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জও কম নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জামায়াত-শিবির এবং অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলের পুনরুত্থান নারীর স্বাধীনতা ও অধিকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তাদের কিছু নেতার নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ও পোশাক নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য সমাজে রক্ষণশীল মনোভাবকে শক্তিশালী করছে, যা নারীর অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। নিরাপত্তা ও সহিংসতা: এক মিশ্র চিত্র রাজনৈতিক সহিংসতার হুমকি নারীর জন্য এক বিরাট উদ্বেগের কারণ। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সংঘাত কিছুটা কমেছে, বিএনপি-ছাত্রদল ও অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই প্রায়শই সহিংস রূপ নিচ্ছে। রাজনৈতিক সমাবেশে নারীদের ওপর হামলা, হয়রানি, ও লাঞ্ছনার ঘটনা তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা দিচ্ছে। একই সঙ্গে, সাইবার সহিংসতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নারী অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নারীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা তথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ, ও হুমকির শিকার হচ্ছেন।
এটি তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করছে। পরিসংখ্যান যা বলছে: সংখ্যার আড়ালে বাস্তবতা বিভিন্ন ডেটা ও পরিসংখ্যান নারীর বর্তমান অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ভোটার সংখ্যাঃ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে মোট ১২ কোটি ৬১ লাখ ৭০ হাজার ৯০০ ভোটারের মধ্যে ৬ কোটি ২১ লাখ ৬২ হাজার ৭৬০ জন নারী। এই বিশাল সংখ্যক নারী ভোটার আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বঃ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও, একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্য মতে, প্রধান দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি নয়। এটি প্রমাণ করে যে, নারী ভোটার বেশি হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের ভূমিকা এখনো যথেষ্ট সীমিত। নারী নির্যাতনঃ পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হাজার হাজার মামলা হয়েছে।
এর মধ্যে ধর্ষণ ও ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি, কারণ অনেক নারী সামাজিক কলঙ্ক ও বিচার না পাওয়ার ভয়ে অভিযোগ করেন না। অর্থনৈতিক প্রভাব ও কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর তথ্য মতে, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ নারী কোনো না কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এই অর্থনৈতিক চিত্রকেও প্রভাবিত করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্থ করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা নারী-নেতৃত্বাধীন ব্যবসাগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। যার ফলে অনেক নারী উদ্যোক্তা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। ২০২৪-২৫ সাল বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। এই সময়টি গণতন্ত্রের দিকে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করলেও, কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পুনরুত্থান নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি, যাতে নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার কোনো অবস্থাতেই হুমকির মুখে না পড়ে।