ড. লুবনা ফেরদৌসী
২৪ জুন ২০ ২৬
৯:৩৩ অপরাহ্ণ

নীরবতা ধর্ষককেই রক্ষা করে, ধর্ষণের শিকার নারীকে নয়

একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েকে রাতভর সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। ও তো নিজের নিরাপত্তার ভাষা জানে না, নিজের ওপর হওয়া সহিংসতার আইনি ব্যাখ্যা দিতে পারে না, নিজের জন্য থানায় দাঁড়িয়ে বিচারও চাইতে পারে না, আর ঠিক এই কারণেই রাতভর দলবেঁধে ধর্ষণ করার জন্য এটা একটা পারফেক্ট বডি। তারপর হাত-পা বেঁধে, বিবস্ত্র অবস্থায়, ধানক্ষেতে ফেলে রাখা হলো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর ভাষায় বলি, এই মেয়ে মানুষ গুলো গরীবের মধ্যে গরীব, ছোটলোকের মধ্যে আরও বেশি ছোটলোক।

এই মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে তো একটা ব্যবহৃত বস্তু। একটা body, একটা flesh। একটা incident! কিন্তু জানেন কি? এখানে ধর্ষিত হয়েছে সভ্যতা মানবতা রাষ্ট্রের নৈতিকতা সব। আমরা বারবার ভুল করি যখন ধর্ষণকে শুধুমাত্র যৌন অপরাধ হিসেবে দেখি। ধর্ষণ যৌনতা না, ধর্ষণ ক্ষমতা। ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণ। ধর্ষণ এমন একজনের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, যে সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে অরক্ষিত, সবচেয়ে কম প্রতিরোধ করতে সক্ষম। আর তাই মানসিক প্রতিবন্ধী নারী, শিশু, গৃহকর্মী, দরিদ্র নারী, তাদের ওপর যৌন সহিংসতা এত বেশি। কারণ ধর্ষক কামুক না, ধর্ষক ক্ষমতালোভী। আবারও মনে করিয়ে দেই Susan Brownmiller এর কথা, rape is not a crime of passion, it is a conscious process of intimidation.ধর্ষণ একটা সচেতন রাজনৈতিক কাজ, ভয় তৈরি করার, ক্ষমতা দেখানোর, মানুষকে মানুষ না ভাবার একটা প্রক্রিয়া। সমাজ নারীর শরীরকে এখনও সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করে, আর তাই ধর্ষণ অপরাধের চেয়েও বেশি, একটা সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এলাকাবাসী বলছে, “মাদকে ছেয়ে গেছে ভূঞাপুর।” এই খানে criminology বলে, যখন substance abuse, impunity, and weak policing একসাথে থাকে, তখন sexual violence dramatically increases।

মাদক একা ধর্ষণ ঘটায় না, কিন্তু মাদক + পুরুষতান্ত্রিক entitlement + আইনি দায়হীনতা = ভয়াবহ যৌন সহিংসতা। যে যুবক ছোটবেলা থেকে শিখেছে নারী মানে নিয়ন্ত্রণযোগ্য শরীর, যে রাজনৈতিকভাবে জানে তার “ভাই” তাকে বাঁচিয়ে দেবে, যে থানাকে ভয় পায় না,যে জানে সমাজ শেষে মেয়েটাকেই দোষ দেবে, সে ধর্ষণকে opportunity হিসেবে দেখে অপরাধ হিসেবে না। আর প্রশাসন? সেই ভাঙা কলের রেকর্ড বাজায়, “তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বাংলাদেশের নারীরা এই বাক্য এতবার শুনেছে যে এটা এখন রাষ্ট্রীয় কবিতা হয়ে গেছে।একজন বিবস্ত্র, হাত-পা বাঁধা, মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়েকে ধানক্ষেতে ফেলে রাখা হয়েছে, এখানে “তদন্ত সাপেক্ষে” কী? রাষ্ট্র কি এখনও নিশ্চিত না যে এটা অপরাধ? নাকি প্রশাসনের অভিধানে জরুরি শব্দটি কেবল ভিআইপি নিরাপত্তার জন্য সংরক্ষিত? পুলিশ আসে ঘটনার পরে।মিডিয়া আসে ক্যামেরা নিয়ে। রাজনীতি আসে নীরবতা নিয়ে। বিচার আসে, তো আসে আসে না। আপনারা কি ভাবছেন, এই অপরাধীরা এত সাহস পেল কোথা থেকে? কারণ তারা জানে, এই দেশে ধর্ষণের থেকেও বড় শক্তি হলো বিচারহীনতা।তারা জানে, থানায় ফোন যাওয়ার আগে রাজনৈতিক ফোন যাবে।তারা জানে, মামলা হবে, তারপর ধামাচাপা হবে। তারা জানে, কয়েকদিন ফেসবুকে ক্ষোভ থাকবে, তারপর নতুন খবর আসবে।

তারা জানে, মেয়েটি মানসিক ভারসাম্যহীন, তার কণ্ঠ আদালতে “বিশ্বাসযোগ্য” বলে গণ্য হবে না। অর্থাৎ ধর্ষণের আগেই তারা জানে, রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে না, প্রায়শই তাদের পক্ষেই। আর, এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। ধর্ষক রাষ্ট্রের নীরবতার রাজনৈতিক সুবিধাভোগী। এই মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েটি কি আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের ধর্ষণের বিবরণ দিতে পারবে? তার consent, তার trauma, তার testimony, এসব কে অনুবাদ করবে? ফেমিনিস্ট লিগ্যাল থিওরি বলে, আইন নিজে নিরপেক্ষ না। আইন প্রায়ই সেই মানুষদের জন্য সবচেয়ে কম কার্যকর, যারা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী নারী, দরিদ্র নারী, গ্রামীণ নারী, তারা বিচার ব্যবস্থার প্রান্তে থাকে। এখানে পরিবার বলছে, “মেয়েটি জন্ম থেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন।” আর এই বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কেননা একজন vulnerable নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে vulnerability ই হয়ে যায় শিকারের লাইসেন্স। আর সমাজ? সমাজ হঠাৎ অবাক হয়। “ওর সাথে এমন হলো কীভাবে?” কেন হবে না? যে সমাজ প্রতিবন্ধী নারীকে রাস্তায় নিরাপদ চলার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, যে সমাজ মাদকসেবী সন্ত্রাসীদের চেনে কিন্তু থামায় না, যে সমাজ ছেলেদের মানুষ না বানিয়ে শুধু পুরুষ বানায়, সেই সমাজে এটাই তো স্বাভাবিক পরিণতি। আমরা শিশুদের consent শেখাই না।ছেলেদের accountability শেখাই না।স্কুলে sexuality education হারাম।কিন্তু দলবেঁধে ধর্ষণ, এটা নিয়মিত headline। তারপরও সমাজ বলবে— “মেয়েরা সাবধানে চলবে।” “রাতে বের হবে না।” “পোশাক ঠিক রাখবে।” অবশ্যই। মেয়েরা পোশাক পরে থাকবে আর সম্মানিত ধর্ষকরা এসে মেয়দেরকে উলঙ্গ করবে। অসাধারণ সভ্যতা। ছেলেদের মানুষ বানানোর চেয়ে মেয়েদের অদৃশ্য করে দেওয়া সহজ। আমরা এমন এক দেশে বাস করি, যেখানে যৌন শিক্ষা হারাম, কিন্তু যৌন সহিংসতা নিত্যদিনের সংবাদ। যেখানে গান শুনলে নাকি পুরুষের ধর্ষণ করতে ইচ্ছা হয়, তাই গান বন্ধ করতে হবে। কিন্তু মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ হলে আমরা বলি, “বিষয়টা চেপে যান, প্রতিষ্ঠানের মান-সম্মান আছে।” শুনলে ধর্ষণের কারণ বানাও এবার… রাতের রাস্তা, ফেসবুক, স্বাধীনতা, সবকিছুকে দায়ী করি। নারীকে রাতের রানী বানাই।

কিন্তু ধর্ষক পুরুষকে দায়ী করতে আমাদের ভয় লাগে। কারণ তাতে পরিবার,সমাজ, ধর্মীয় বক্তারা অস্বস্তিতে পড়ে। রাজনীতি অস্বস্তিতে পড়ে। নারী মরুক, কিন্তু patriarchy অস্বস্তিতে পড়বে না। এই হলো আমাদের নৈতিকতা। আরেকটা নির্মম সত্য হলো, এই দেশে ধর্ষণ নিয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, কিন্তু পুরুষতন্ত্র নিয়ে না। কারণ ধর্ষককে শাস্তি চাই, কিন্তু ধর্ষক তৈরি করে যে সংস্কৃতি, সেটাকে আমরা সংসার, tradition, honour, masculinity বলে রক্ষা করি। এই ঘটনায় সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস কেবল ধর্ষণ না, এটা আমাদের collective desensitization। আমরা খবর পড়ি। দুই মিনিট ক্ষোভ দেখাই। তারপর স্ক্রল করে পরের পোস্টে চলে যাই। আবার নতুন আমেজে কালকে আরেকটা মেয়ে ধর্ষিত হবে, আমি আবার লিখতে বসবো, পরশু লিখেছি ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বার সম্ভাব্য ধর্ষণের কারণে হত্যা নিয়ে, গতকাল লিখেছি মাদ্রাসার হুজুর দারা ১৩ বছরের ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং মৃত্যু, সেই সাথে আরও কয়েকটা মেয়ের মৃত্যু একই কারণে, আর আজকে লিখেছি মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে গ্যাং রেপের শিকার, উন্নয়নের সূচক এখানে মেয়েটা নগ্ন হাত পা বাঁধা অবস্থায় ধানখেতে পড়ে ছিলো শুধু, মরে নাই। এভাবেই ধর্ষণ সংস্কৃতি বেঁচে থাকে, শুধু ধর্ষকের হাতে না, দর্শকের অভ্যাসে।আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশে ধর্ষণ সমস্যা না, symptom। সমস্যা হলো patriarchy, রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, বিচারহীনতা।সমস্যা হলো মাদক-রাজনীতি-পুলিশি ব্যর্থতার জোট। সমস্যা হলো আমরা এখনও নারীর নিরাপত্তাকে “নারীর দায়িত্ব” ভাবি। মনে রাখবেন, Silence does not protect women. Silence protects rapists.

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ